বাংলাদেশের সংগীত জগতে ব্ল্যাক একটি সুপরিচিত নাম। ১৯৯৮ সালে ঢাকায় গঠিত এই ব্যান্ডটি বিকল্প রক ধারার সংগীতে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। তাদের সংগীতে আধুনিক সুর ও গানের কথায় সমাজের বিভিন্ন দিক প্রতিফলিত হয়েছে, যা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।

A photo of present band members
ব্ল্যাক-এর বর্তমান লাইনআপ(২০১৯)


গঠনের ইতিহাস ও শুরু

১৯৯৮ সালে ঢাকায় ব্ল্যাক ব্যান্ডের জন্ম হয়। প্রতিষ্ঠাতা সদস্যরা ছিলেন:

  • জন কবির (লিড ভোকাল ও রিদম গিটার)

  • খাদেমুল জাহান  (লিড গিটার)

  • টনি ভিনসেন্ট (ড্রামস)

  • মাহমুদুল করিম মিরাজ (বেজ গিটার)

পরবর্তীতে ২০০০ সালে তাদের সাথে যুক্ত হন:

  • তাহসান রহমান খান (কীবোর্ড ও ভোকাল)


ব্ল্যাক-এর অ্যালবামসমূহ ও বিবরণ

১. আমার পৃথিবী (২০০২)

ব্ল্যাকের প্রথম স্টুডিও অ্যালবাম "আমার পৃথিবী" প্রকাশিত হয় ২০০২ সালে। এই অ্যালবামটি তাদের বিকল্প রক ধারার সংগীতের মাধ্যমে শ্রোতাদের মধ্যে দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

গানসমূহ:

০১. আমরা
০২. অভিমান
০৩. আমার পৃথিবী
০৪. কবর
০৫. বিখ্যাত
০৬. প্রার্থনাদ  Click here to watch guitar cover version
০৭. এখনো
০৮. কোথায়?
০৯. মানুষ
১০. অন্ধকারের পাশে
১১. মিথ্যা
১২. দুঃখের রং

২. উৎসবের পর (২০০৩)

দ্বিতীয় অ্যালবাম "উৎসবের পর" প্রকাশিত হয় ২০০৩ সালে। এই অ্যালবামে ব্যান্ডটি তাদের সংগীতে নতুন মাত্রা যুক্ত করে।

গানসমূহ:

০১. ?
০২. ও
০৩. পোড়াহতো
০৪. ইচ্ছা
০৫. অনুঘটন
০৬. উৎসবের পর
০৭. অপমিত
০৮. একই রকম
০৯. এই ছায়াপথে
১০. রুদ্ধবোধ
১১. শ্লোক
১২. ৬ই সেপ্টেম্বর
১৩. মিছিমিছি
১৪. প্রাকৃতিক
১৫. একা
১৬. বিমূর্ত

৩. আবার (২০০৮)

২০০৫ সালে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় ব্যান্ডের সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার ইমরান আহমেদ চৌধুরী মুবিন মারা যান এবং বেজ গিটারিস্ট মাহমুদুল করিম মিরাজ ও ড্রামার টনি ভিনসেন্ট গুরুতর আহত হন। এই দুর্ঘটনার পর কিছু সময় বিরতি নিয়ে ২০০৮ সালে তারা প্রকাশ করে "আবার" অ্যালবামটি।

গানসমূহ:

০১. মানুষ-পাখির গান
০২. আবার
০৩. অবহমান
০৪. অবস
০৫. শরবিদ্ধ
০৬. এই গান
০৭. না-থাকা জীবন
০৮. করুণ
০৯. চিহ্ন
১০. কেনো

৪. ব্ল্যাক (২০১১)

২০১১ সালে ব্যান্ডটি তাদের স্বনামধন্য অ্যালবাম "ব্ল্যাক" প্রকাশ করে। এই অ্যালবামে তাদের সংগীতে পরিপক্কতা ও নতুন সুরের সংমিশ্রণ দেখা যায়।

গানসমূহ:

০১. হাত বাড়াও
০২. পেপার-রেডিও-টিভি
০৩. আমার পৃথিবী (রিটেক)
০৪. আত্মকেন্দ্রিক
০৫. মুমূর্ষু রূপকথা
০৬. আজও...
০৭. নীলগিরি
০৮. জীবনের বাঁ-পাশ
০৯. পুরোনো সেই দিনের কথা
১০. উপসংহার
১১. একজন

৫. উনমানুষ (২০১৬)

২০১৬ সালে প্রকাশিত "উনমানুষ" অ্যালবামটি ছিল ব্যান্ডের অন্যতম এক্সপেরিমেন্টাল ও প্রগতিশীল সংগীত সংকলন।

উল্লেখযোগ্য গানসমূহ:

  • উনমানুষ

  • দেয়াল


সদস্য পরিবর্তন ও বর্তমান লাইনআপ

ব্যান্ডটির দীর্ঘ পথচলায় বেশ কয়েকবার সদস্য পরিবর্তন হয়েছে। প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের মধ্যে অনেকেই ব্যান্ড ত্যাগ করেছেন বা নতুন সদস্য যুক্ত হয়েছেন।

প্রাক্তন সদস্যরা:

  • তাহসান রহমান খান (কীবোর্ড ও ভোকাল) - ২০০৫ সালে ব্যান্ড ত্যাগ করেন।

  • মাহমুদুল করিম মিরাজ (বেজ গিটার) - ২০০৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনার পর ব্যান্ড ছেড়ে দেন।

  • বেজ বাবা সুমন (বেজ গিটার) - মিরাজের স্থলাভিষিক্ত হয়ে প্রায় এক বছর ব্যান্ডের সাথে যুক্ত ছিলেন।

  • খান শাহরিয়ার সাগর (বেজ গিটার) - সুমনের পর ব্যান্ডে যোগ দেন এবং "আবার" অ্যালবামে কাজ করেন। ২০১০ সালে ব্যান্ড ছেড়ে দেন।

  • রফিকুল আহসান টিটু (বেজ গিটার) - সাগরের পর কিছু সময় ব্যান্ডের সাথে যুক্ত ছিলেন।

বর্তমান সদস্যরা:

  • ইশান হোসেন – ভোকালস, রিদম গিটার (২০২১–বর্তমান)

  • খাদেমুল জাহান – লিড গিটার (১৯৯৮–বর্তমান)

  • মেহমুদ আফ্রিদি টনি – ড্রামস, পারকাশন, ব্যাকিং ভোকাল (১৯৯৮–বর্তমান)

  • চার্লস ফ্রান্সিস – বেজ (২০১৪–বর্তমান)

  • ফারহান তানভীর – ড্রামস (২০১৮–বর্তমান)


ব্ল্যাক-এর সংগীতশৈলী ও প্রভাব

ব্ল্যাকের সংগীতে অল্টারনেটিভ রক, প্রোগ্রেসিভ রক এবং ইন্ডি রকের সংমিশ্রণ লক্ষ্য করা যায়। তাদের গানের কথা আবেগপ্রবণ, দার্শনিক এবং কখনো কখনো বিদ্রোহী। তরুণ প্রজন্মের মানসিক দ্বন্দ্ব, প্রেম-বিচ্ছেদ, এবং জীবন সম্পর্কে গভীর উপলব্ধির কথা তাদের গানে বিশেষভাবে ফুটে ওঠে।

বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতে হার্ড রক, মেলোডিক রক এবং গ্রাঞ্জ প্রভাবিত ব্যান্ডগুলোর পাশাপাশি ব্ল্যাক তাদের স্বতন্ত্রতা বজায় রেখে বিকল্প ধারার ব্যান্ডসংগীতকে জনপ্রিয় করেছে। তাদের অনুপ্রেরণায় আরও অনেক নতুন ব্যান্ড বিকল্প রকের দিকে ঝুঁকেছে।


ব্ল্যাক-এর ভবিষ্যৎ

ব্ল্যাক বর্তমানে নতুন গান তৈরির কাজ করছে এবং স্টেজ পারফরম্যান্সেও সক্রিয়। নতুন সদস্যদের সঙ্গে ব্যান্ডটি তাদের সংগীতধারায় নতুন মাত্রা যোগ করার চেষ্টা করছে। যদিও তাদের পুরনো সদস্যদের অনেকেই ব্যান্ড ছেড়েছেন, তবুও ব্যান্ডটি তার স্বকীয়তা ধরে রেখে এগিয়ে চলেছে।


উপসংহার

বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের ইতিহাসে ব্ল্যাক একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রচনা করেছে। তাদের বিকল্প রক ধারার গান, ব্যতিক্রমী সুর এবং শক্তিশালী গীতিকবিতা শ্রোতাদের মন জয় করে নিয়েছে। বিভিন্ন প্রতিকূলতা ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়েও ব্যান্ডটি এখনো সংগীত জগতে সক্রিয় রয়েছে, যা তাদের শক্তি ও দৃঢ়তাকে প্রতিফলিত করে।

ব্ল্যাকের গান কেবল বিনোদনের জন্য নয়, বরং এক গভীর আবেগ ও অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ। তারা বাংলাদেশের রকসংগীতকে নতুন মাত্রা দিয়েছে এবং আগামী দিনেও সংগীতপ্রেমীদের জন্য নতুন চমক নিয়ে আসবে।